রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪, ০১:৩৭ পূর্বাহ্ন

ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে খুনের তালিকা উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে

প্রতিনিধির / ১২০ বার
আপডেট : শনিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২২
ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে খুনের তালিকা উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে
ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে খুনের তালিকা উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে

খুনের শিকার রোহিঙ্গাদের স্বজন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, ক্যাম্পে মাদক-অপহরণসহ নানা অপরাধে জড়িতদের বিষয়ে সহযোগিতা কিংবা কোনো মামলার সাক্ষী হলেই দুর্বৃত্তদের টার্গেটে রূপান্তর হচ্ছেন সাধারণ রোহিঙ্গারা। আর প্রতিটি আশ্রয় শিবির পাহাড়বেষ্টিত হওয়ায় খুন করে সহজে আত্মগোপনে চলে যেতে পারছে খুনিরা, এমনটি ধারণা তাদের। নিরাপত্তা ও অপরাধী নির্মূলে প্রয়োজনে ক্যাম্পে সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চালানোর দাবি করেন তারা।

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে খুনের তালিকা। চলতি মাসেই ৯ জন খুনের শিকার হয়েছেন। গত ৫ মাসে খুন হয়েছেন ২৫ জন। খুনের শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের বেশিভাগই ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কমিটির নেতা (মাঝি) ও স্বেচ্ছাসেবক। এতে আতঙ্কিত সাধারণ রোহিঙ্গারা। এছাড়া উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন ক্যাম্পের আশপাশের স্থানীয়রাও।

সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ অক্টোবর) ভোরে কুতুপালং ১৭ নম্বর ক্যাম্পের সি-ব্লকের বাসিন্দা কেফায়েত উল্লাহর ছেলে আয়াত উল্লাহ (৪০) এবং মোহাম্মদ কাসিমের ছেলে ইয়াছিন (৩০)-কে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এদিন ভোরে ১৫ থেকে ২০ জনের একদল দুর্বৃত্ত ১৭ নাম্বার ক্যাম্পের সি-ব্লকে সশস্ত্র হামলা চালায়। হামলাকারীরা আয়াত উল্লাহ এবং ইয়াছিনকে বাড়ির বাইরে এনে গুলি করে পালিয়ে যায়। আর ঘটনাস্থলেই ইয়াছিনের এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে আয়াত উল্লাহর মৃত্যু হয়, এমনটি জানিয়েছেন ক্যাম্পে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৪ এপিবিএনর অধিনায়ক এডিআইজি সৈয়দ হারুনুর রশিদ। তবে, কারা এবং কোন কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি- কয়েকজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নিহত আয়াত উল্লাহ’র ভাই সালামত উল্লাহ জানান, তার ভাই ক্যাম্প-৫ ডিতে চাকরি করতো। পাশাপাশি ক্যাম্পে তৎপর অপরাধীদের নানা অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কথা বলতো, এবং প্রশাসনকে সহযোগিতা করতো। তাই হয়তো অপরাধীরা মুখোশ পরে এসে এ হত্যার ঘটনা ঘটান।

নিহত ইয়াছিনের ভাই হাছান জানান, নিহত আয়াত উল্লাহর এক ভাইয়ের হাত ও পা কেটে ফেলেছিলো দুর্বৃত্তরা। তখন মাঝি ও পুলিশকে আমার ভাই ইয়াছিন সহযোগিতা করেছে। অপরাধীদের গতিবিধি সম্পর্কে নজর রেখে প্রশাসনকে জানাতেন। হয়তো এজন্য দুর্বৃত্তরা টার্গেট করে আমার ভাইকে মেরে ফেলেছে। তারা ভাইকে মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন অংশে কুপিয়েছে। আমাকেও ধরার চেষ্টা করেছিল, অন্যদিকে পালিয়ে যাওয়ায় আমি রক্ষা পেয়েছি। নিরাপদ থাকলে হলে ক্যাম্পে সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চালানো দরকার বলে দাবি করেন হাছান।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১২৪ টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে গত ৫ মাসে (২৭ অক্টোবরের ২ জনসহ) খুনের শিকার হন ২৫ জন। যার মধ্যে শুধু অক্টোবরেই ঘটে ৯টি খুনের ঘটনা। গত ২৬ অক্টোবর ক্যাম্প ১০-এ খুন হন মোহাম্মদ জসিম। একইদিন মো. সালাম নামের অপর রোহিঙ্গা গুলিবিদ্ধ হন। ১৮ অক্টোবর ক্যাম্প ১৯-এ খুন হন সৈয়দ হোসেন। সৈয়দ হোসেন এর পিতা জামাল হোসেন খুন হন ১০ অক্টোবর। পিতা হত্যার মামলায় বাদী হওয়া এবং আসামিদের ধরতে তৎপর থাকায় সৈয়দ হোসেনকে খুন করা হয় বলে মন্তব্য করেন ৮ এপিবিএন’র সহকারী পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমেদ। ১৫ অক্টোবর ক্যাম্প ১৩ এর মাঝি মোহাম্মদ আনোয়ার ও সাব মাঝি মোহাম্মদ ইউনুছকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১২ অক্টোবর হত্যা করা হয় ক্যাম্প ৯ এর সাব মাঝি মোহাম্মদ হোসেনকে। ৪ অক্টোবর এবিপিএনর সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলিতে নিহত হন তাসদিয়া আকতার (১১) নামের এক শিশু।

এর আগে গত ৪ মাসে খুন হন ১৬ জন। এর মধ্যে ২২ সেপ্টেম্বর খুন হন মোহাম্মদ এরশাদ (২২) নামের একজন স্বেচ্ছাসেবক। ২১ সেপ্টেম্বর খুন হন মোহাম্মদ জাফর (৩৫) নামের এক নেতা (মাঝি)। ১৮ সেপ্টেম্বর খুন হন আরেক স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ ইলিয়াস (৩৫)। ৯ আগস্ট দুই রোহিঙ্গা নেতা, ৮ আগস্ট টেকনাফের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক স্বেচ্ছাসেবক খুন হন। ১ আগস্ট একই ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এক রোহিঙ্গা নেতা। একইদিন (১ আগস্ট) উখিয়ার মধুরছড়া ক্যাম্পে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক, গত ২২ জুন কথিত একটি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপের নেতা মোহাম্মদ শাহ এবং ১৫ জুন একই গ্রুপের সদস্য মো. সেলিম (৩০) সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। ১৬ জুন রাতে উখিয়া ক্যাম্পে স্বেচ্ছাসেবক, ১০ জুন কুতুপালংয়ের চার নম্বর ক্যাম্পের আরেক স্বেচ্ছাসেবক, ৯ জুন এক রোহিঙ্গা নেতা, ১ জুন খুন হন রোহিঙ্গা নেতা সানা উল্লাহ (৪০) ও সোনা আলী (৪৬)।

মধুরছরা ক্যাম্পের বাসিন্দা সালামত খান বলেন, আশ্রিত জীবনে একটু স্বস্তিতে থাকতে চাইলেও পারছি না। আমাদেরই মাঝে একটি চক্র অদৃশ্য ইশারায় খুনের মতো অপরাধকাণ্ড ঘটাচ্ছে। আমাদের নির্যাতন করছে, কথায় কথায় খুন করছে। আমরা পুলিশকে এসব বিষয় জানিয়েছি। যারা তাদের অপকাণ্ডের ঘটনায় বাদী হয়েছে, সাক্ষী হয়েছে, তাদের টার্গেট করেই দুর্বৃত্তরা মেরে ফেলছে। আমরা নিরাপত্তা চাইছি- প্রয়োজনে সেনা টহল দেওয়া হউক।

উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের কুতুপালং এলাকার সদস্য প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, বিগত ৪-৫ মাস ধরে ক্যাম্পে খুনোখুনি, মারামারি, গোলাগুলিসহ নানা ধরণের অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। নিরাপত্তা জোরদারের পরও প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো ক্যাম্পে হত্যা বা হামলার ঘটনা সবাইকে আতঙ্কিত করে রাখছে। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদ সাধারণ সম্পাদক ও পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পালংখালী ও উখিয়া ইউনিয়নজুড়েই অধিকাংশ রোহিঙ্গার বসবাস। ২০১৭ সালে মানবিকতার কারণে অনেকের ঘরের উঠানেও রোহিঙ্গাদের ঘর করে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। সেটাই এখন কাল হয়েছে স্থানীয়দের। ক্যাম্পের আশপাশে রয়েছে বিপুল সংখ্যক স্থানীয় পরিবার। রোহিঙ্গা দুর্বৃত্তদের কারণে নিজ দেশে পরবাসীর মতোই সন্ধ্যার পর প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন তারা। আমি নিজেও খুবই আতঙ্কে থাকি। রোহিঙ্গাদের হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র দেখা যায়। চলার পথে হুট করে গুলি করে চলে গেলে করার কিছু থাকবে না।

তিনি আড়ও জানান, আশ্রয় শিবিরগুলো পাহাড় বেষ্টিত হওয়ায় অপরাধীরা দ্রুত গা-ঢাকা দিতে পারে। তাই পরিস্থিতি শান্ত করতে চাইলে যত দ্রুত সম্ভব কঠোর অভিযানে ক্যাম্পে অপরাধীদের কাছে থাকা অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা জরুরী। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চালাক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপরও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা দরকার বলে উল্লেখ করেন তিনি।

৮ এপিবিএন (অপস্ অ্যান্ড মিডিয়া)’র সহকারী পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন, ক্যাম্পে মাদক ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিরোধসহ নানা কারণে খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। পাশাপাশি অপরাধীদের তথ্য প্রদান বা তাদের অপরাধকাণ্ডে কাউকে বাঁধা হিসেবে দেখলেও প্রতিপক্ষ হিসেবে টার্গেট করে খুনোখুনির ঘটনা ঘটাচ্ছে।

তিনি আরো জানান, গত ২৬ অক্টোবর খুনের শিকার রোহিঙ্গা জসিম (২৫) হত্যার ঘটনায় ক্যাম্প-৯ ও ১০ এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এজাহারনামীয় ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পানবাজার পুলিশ ক্যাম্প সদস্যরা। গ্রেফতাররা হলেন- একরাম উল্লাহ (৩০), শাকের (৩৮), জাবের (২৩), নুরুল আমিন (২৭) ও আমির হোসেন (১৯)। তারা ৯ ও ১০ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা। জসিম হত্যার পর তার মা সুফিয়া খাতুন বাদী হয়ে উখিয়া থানায় হত্যা মামলা (নং-৮৮/২০২২) করেছেন। গ্রেফতারকৃতদের সেই মামলায় থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। ক্যাম্প এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও প্রতিটা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতারে জোর তৎপরতা চলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

উখিয়া থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ক্যাম্পে প্রতিটি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারে এপিবিএন ও পুলিশ যৌথভাবে তৎপরতায় রয়েছে। চলছে মামলার তদন্তও।

কক্সবাজারের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, ক্যাম্পের নিরাপত্তায় ৮, ১৪, ১৬ তিনটি এপিবিএন ব্যাটালিয়ন একাধিক ইউনিটে ভাগ হয়ে কাজ করছে। তাদের সফলতাও অনেক। কিন্তু পাহাড়বেষ্টিত আশ্রয় শিবির হওয়ায় দ্রুত অপরাধী শনাক্ত ও আটক কষ্টকর। ক্যাম্প এলাকায় সামগ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান চালানোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলে আলোচনা করা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: