রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ০৫:১৬ অপরাহ্ন

হবিগঞ্জের হাওরে দীর্ঘদিন পানি থাকায় বেড়েছে শালুক উৎপাদন

প্রতিনিধির / ১৩৪ বার
আপডেট : শুক্রবার, ১১ নভেম্বর, ২০২২
হবিগঞ্জের হাওরে দীর্ঘদিন পানি থাকায় বেড়েছে শালুক উৎপাদন
হবিগঞ্জের হাওরে দীর্ঘদিন পানি থাকায় বেড়েছে শালুক উৎপাদন

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হবিগঞ্জের বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, মাধবপুর, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলার একাংশের হাওর এলাকা বর্ষাকালে পানিতে ডুবে থাকে। পানি বেশি হলে শাপলা, শালুক, পানিফলসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদে হাওর পরিপূর্ণ থাকে। বর্ষার শেষে শরতের আগমনের সাথে সাথে পানি কমতে শুরু করে। এ সময় সংগ্রহ করা হয় এ ধরনের ফল।

এবারের বন্যার পর মাছের পাশাপাশি বেড়েছে শালুক উৎপাদন। হাওরে দীর্ঘদিন পানি থাকায় এই উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন হাওরের পানি কমতে থাকায় কৃষকরা শালুক আহরণ করে বাজারে বিক্রি করছেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার শালুকের দামও বেশি।ফলে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা।

বানিয়াচং উপজেলার কাগাপাশা ইউনিয়নের চানপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল জব্বার জানান, বর্ষা শেষে হাওরের পানি কমলে বোরো ফসলের জন্য জমির আগাছা পরিষ্কার করা হয়। এ সময় শালুক ও পানিফল সংগ্রহ করা হয়। কেজিপ্রতি ৪০-৫০ টাকা পাইকারি দরে শালুক বিক্রি হয়। বাজারে মান অনুযায়ী ৮০-১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয় শালুক।

ওই গ্রামের কৃষক মিজান মিয়া জানান, এক সময় গ্রামে অভাবের সময় অতিদরিদ্র মানুষ বিল থেকে শালুক তুলে এনে সিদ্ধ করে ভাতের বিকল্প হিসেবে খেত। এখন দাম বেশি হওয়ায় তা বাজারে বিক্রি করে অনেকেই প্রয়োজনীয় বাজার কেনেন।

হাওর থেকে সংগ্ৃহীত শালুক পাইকাররা কিনে এনে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন। হবিগঞ্জ শহরের হাট-বাজারের বাইরে শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ভ্যানেও বিক্রি করা হয় এই ফল। হবিগঞ্জ জেলায় শালুকের অন্যতম পাইকারি হাট মাধবপুর উপজেলায়। সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার পাশের জেলা মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের ব্যবসায়ীরা শত শত মণ শালুক নিয়ে আসেন মাধবপুরে। আবার পাইকারদের হাতবদল হয়ে সেই শালুক চলে যায় রাজধানী ঢাকাসহ কুমিল্লা, সরাইল, ভৈরব, নরসিংদী, চাঁদপুরের মতাে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকারদের কাছে। বিক্রেতারা প্রতি মণ শালুক এই মৌসুমে তিন-সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেন।

হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. দেবাশীষ দাশ জানান, একেকটি শালুকের ওজন ৩০ গ্রাম থেকে ৬০-৭০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। হজম শক্তি বৃদ্ধিকারক এ সবজিটি কাচা খাওয়ার উপযোগী হলেও আগুনে পুড়িয়ে কিংবা সেদ্ধ করে খাওয়া যায়। শালুক দ্রুত ক্ষুধা নিবারণের সঙ্গে শরীরে পর্যাপ্ত শক্তিও জোগায়। শালুকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা পিত্ত প্রশান্তিদায়ক ও পিপাসা নিবারণ করে। তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে অ্যালার্জি ও প্রচুর আয়রন থাকায় অনেকের কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে।বানিয়াচং উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আলী হায়দার জানান, এবার বন্যার কারণে হাওরে রেকর্ড পরিমাণ শালুক হয়েছে। এটি শাপলাগাছের গোড়ায় জন্মানো সবজি জাতীয় খাদ্য। শাপলার গোড়ায় একাধিক গুটির জন্ম হয়। যা ধীরে ধীরে বড় হয়ে শালুকে পরিণত হয়। এটি সেদ্ধ করে বা আগুনে পুড়িয়ে ভাতের বিকল্প হিসেবে খাওয়া যায়।

হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. সুভাষ চন্দ্র দেব জানান, শাপলাগাছের রাইজোমই শালুক নামে পরিচিত। শাপলার গোড়া যেখানে মাটিতে নোঙর করে সেখানে কন্দাল মূলে গুটির মতো দেখা যায়, পরিণত গাছে এটি বড় হয়ে প্রজাতিভেদে ৫০-৭০ গ্রাম ওজনের শালুক হয়। এটি প্রাকৃতিকভাবেই জন্মায়। ভাটি বাংলার আদি এবং জনপ্রিয় এই শালুক ফল নানাভাবে খাওয়া হয়। দুর্ভিক্ষ-দারিদ্র্যে ভাতের বিকল্প হিসেবে এটি অনন্য সম্বল। আমাদের জলাভূমিতে যত দিন পানি থাকে, ত তদিন শাপলাও থাকে। হাওরগুলোতে লাল ও সাদা শাপলা দেখা গেলেও প্রকৃতিতে এর প্রজাতি সংখ্যা ৭০-এর বেশি।

তিনি আরও জানান, শালুকের রয়েছে অসাধারণ ভেষজগুণ। এটি ক্ষুধা নিবারণ করে দেহে দ্রুত শক্তি জোগায়। চুলকানি ও রক্ত আমাশয় নিবারণে লাল শালুক প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শালুকের ক্যালসিয়াম আলুর চেয়ে সাত গুণ বেশি। এ ছাড়া এর শর্করা ভাতের চেয়েও ভালো, যা ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য উপকারী। এটি প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া, পিত্তঅম্ল এবং হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা দূর করে। এ জন্যই আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে সুপ্রাচীন কাল থেকে শালুক এত জনপ্রিয়। সম্প্রতি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এতে পেয়েছেন গ্যালিক এসিড, যা ক্যান্সার চিকিৎসায় কাজে আসবে। এছাড়া এতে প্রাপ্ত ফ্লেভনল গ্লাইকোসাইড রক্ত সঞ্চালনে সাহায্য করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মাথা ঠাণ্ডা রাখে।

তিনি আরও বলেন, গ্রামবাংলার এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী শালুক এখন হারাতে বসেছে। জমিতে অতিমাত্রায় সার ও কীটনাশক প্রয়োগ চলতে থাকলে একসময় ‘ঝিলের জলে শালুক ভাসে’ কেবল কবিতায়ই পড়া হবে, বাস্তবে দেখা মিলবে না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: