রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ০৮:১৮ অপরাহ্ন

৫ বছরে সরেনি কেমিক্যাল গোডাউন, ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় বাড়ছে ১১০ কোটি

প্রতিনিধির / ১৩৭ বার
আপডেট : রবিবার, ২ অক্টোবর, ২০২২
৫ বছরে সরেনি কেমিক্যাল গোডাউন, ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় বাড়ছে ১১০ কোটি
৫ বছরে সরেনি কেমিক্যাল গোডাউন, ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় বাড়ছে ১১০ কোটি

একে একে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও ঢাকার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গড়ে ওঠা কেমিক্যাল গোডাউন সরেনি। অথচ এখন আবার ভূমি অধিগ্রহণে ১১০ কোটি ১৩ লাখ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। চলমান প্রকল্পের এমন ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন।

প্রস্তাবিত ‘বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, মুন্সিগঞ্জ (২য় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাবের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়। পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ার সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়।

 

‘বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, মুন্সিগঞ্জ (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পটি ১ হাজার ৬১৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে অনুমোদন হয়। এর আগে জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২২ মেয়াদে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। পরে প্রকল্পটি ‘ঢাকা বিসিক কেমিক্যালপল্লি’শিরোনামে ২০১ কোটি ৮১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২১ মেয়াদে বাস্তবায়নে জন্য একনেক থেকে অনুমোদিত হয়। পরে প্রকল্পের ১ম সংশোধনী একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমসমূহ হলো- কেমিক্যালপল্লি স্থাপনের লক্ষ্যে মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার গোয়ালখালী, চিত্রকুট ও কামারকান্দা মৌজার ৩০৮ দশমিক ৩৩ একর জমি অধিগ্রহণ, ১ হাজার ৮৯৭টি শিল্প প্লট তৈরি, জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বর্তমানে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২৩ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ গ্রহণের লক্ষ্যে পিইসি সভা আহ্বান করা হয়েছে।

 

প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও দ্বিতীয় সংশোধনের কারণ জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলিতে অবস্থিত কেমিক্যাল গোডাউনে সংঘটিত দুর্ঘটনায় বহু হতাহতসহ সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধসহ আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যাল কারখানা-গোডাউন অপসারণের লক্ষ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জে ৫০ একর জমিতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে। বিসিক কেমিক্যালপল্লি স্থাপনের জন্য সরকারি নির্দেশে তাৎক্ষণিকভাবে ‘বিসিক কেমিক্যালপল্লি’শীর্ষক প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। পরে বৃহৎ পরিসরে ও অধিক উপযোগী স্থানে বিসিক কেমিক্যালপল্লিটি স্থাপনের লক্ষ্যে মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলায় স্থান নির্ধারণ করে প্রকল্পটির ১ম সংশোধন করা হয়। মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলায় স্থান নির্ধারণ করে প্রকল্পটি প্রথম সংশোধন করা হয়। প্রকল্পের পূর্ত কাজগুলোর ব্যয় অসামঞ্জস্যতা দূরীকরণ, পিডব্লিউডি রেট শিডিউল ২০২২ অনুসারে ব্যয় প্রাক্কলন, অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ অন্তর্ভুক্তি ও অনাবশ্যকীয় অঙ্গ বাদ দেওয়া হয়।

প্রকল্প এলাকায় বন্যার পানির সর্বোচ্চ লেভেল পর্যন্ত মাটি ভরাট, লেক খনন ইত্যাদি কাজের জন্য প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাব করা হয়েছে। জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২২ পর্যন্ত সময়ে ব্যয় ৬৫৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৪০ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং এর বাস্তব অগ্রগতি ৪৪ দশমিক ২৬ শতাংশ।

পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ১ম সংশোধিত প্রকল্পটি জুন ২০২২ সালে শেষ হওয়া জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দেড় মাস পর প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে এসেছে। প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়াকরণ সংক্রান্ত পরিপত্র অনুসারে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কমপক্ষে তিন মাস আগে সংশোধন প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা প্রতিপালন করা হয়নি।

তিনি আরও বলেন যে, প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ভূমি উন্নয়ন ব্যয় ১৩০ কোটি ১৭ লাখ টাকা টাকা থেকে ১১০ কোটি ১৩ লাখ টাকা বৃদ্ধি করে ২৪০ কোটি ৩০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অত্যাধুনিক বলে মনে হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ সমাপ্তির পরে সংশোধন প্রস্তাব করায় সচিব অসন্তোষ প্রকাশ করে ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেন।

 

তিনি আরও বলেন, নীতিমালা অনুসরণপূর্বক ভবিষ্যতে প্রকল্প মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো সংশোধন প্রস্তাব অনুমোদন প্রক্রিয়াকরণের জন্য বিবেচনা করা হবে না।

সময়-ব্যয় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে প্রকল্পের পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ছে। সময় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন। ঢাকা বিভাগের কেরানীগঞ্জের পরিবর্তে এখন মুন্সিগঞ্জে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

ভূমি উন্নয়ন খাতে বিপুল পরিমাণ ব্যয়বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক জানান যে, মূল অনুমোদিত ডিপিপিতে মোট ১০ ফুট পর্যন্ত মাটি ভরাটের সংস্থান ছিল। কিন্তু পরে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে যে ভূমি বরাদ্দ পাওয়া গেছে তা নিচু জমি। ভূমি উন্নয়নের জন্য বন্যার পানির সর্বোচ্চ লেভেল পর্যন্ত গড়ে ১৭ ফুট পর্যন্ত মাটি ভরাটের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যে কারণে জমি অধিগ্রহণ ব্যয় বাড়ছে। ফ্ল্যাড লেভেল হাই করা হচ্ছে। যাতে প্রকল্প এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ না করে। প্রকল্প যদি না ডুবে যায় সেই চিন্তা করে মাটি ভরাট কাজ আরও হাই করা হচ্ছে।

জুলাই ২০১৮ থেকে আরম্ভ হয়ে জুন ২০২২ পর্যন্ত চার বছরে প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ৪৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। এ পরিপ্রেক্ষিতে জমির কাজ সম্পন্ন করতে প্রকল্প মেয়াদ এক বছর অর্থাৎ জুন ২০২৩ পর্যন্ত বৃদ্ধি বাস্তবসম্মত কি না এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ঊধ্র্বতন এক কর্মকর্তা জানান, অনুমোদিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) অনুসারে ভূমি উন্নয়ন কার্যক্রম প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু বন্যার সর্বোচ্চ লেভেল পর্যন্ত মাটি ভরাট করে সব পূর্ত কাজ সম্পন্ন করতে আরও দেড় বছর সময় লাগবে। সে পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ জুন ২০২৪ পর্যন্ত হলে ভালো হয়।

প্রকল্পে নতুন কাজ হিসেবে মসজিদ, মেডিকেল সেন্টার, ব্রিজ নির্মাণ, লেক খনন এবং নদীর পাড় রক্ষার জন্য বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক জানান, জমির ওপর দিয়ে হাই ভোল্টেজ ইলেক্ট্রিক লাইন চলে গেছে বিধায় এ স্থানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক পুকুরের পরিবর্তে লেক নির্মাণ এবং সংযোগ রক্ষার্থে লেকের ওপর চারটি ব্রিজ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুসারে নদীর তীর রক্ষার সংস্থান রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্প এলাকায় যে সাততলা বিশিষ্ট অফিস ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে সেখানেই মেডিকেল সেন্টার ও নামাজ পড়ার স্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে আলাদা করে মেডিকেল সেন্টার ও মসজিদ নির্মাণ প্রয়োজন হবে না এবং সরকারি অর্থের সাশ্রয় হবে।

পরিকল্পনা কমিশন জানায়, লেকের ওপর চারটি ব্রিজ নির্মাণের পরিবর্তে সম্ভব হলে লেকটি দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। অথবা একটি ব্রিজের মাধ্যমে লেকের দুই পাড়ের সংযোগ রক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

পরিকল্পনা কমিশন জানায়, প্রকল্প এলাকাটি দুটি নদী ধলেশ্বরী ও ইছামতির মিলনস্থলে অবস্থিত। এমন একটি স্থানে কেমিক্যালপল্লি স্থাপনে অবশ্যই পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হবে।

এছাড়া নদী তীর থেকে অন্তত ১০০ ফুট জায়গা ছেড়ে দিয়ে কেমিক্যালপ পল্লীর বাউন্ডারি নির্মাণ এবং সে আলোকে লে-আউট প্ল্যান সংশোধন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রকল্প এলাকায় কেমিক্যাল শিল্প ও গোডাউন উভয় ধরনের স্থাপনাই থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
%d bloggers like this:
%d bloggers like this: